“ টিউলিপ ”
রুপনগর, চারপশে
নতুন নতুন বিল্ডিং আর বিল্ডিং। মহল্লার ভেতর দিয়ে দ্রুত পায়ে হাটছে চয়ন। রাত দশটা বাজে।
চার পাশ থম থমে পরিবেশ। শেষের টিউশনিটা রাত সারে নয়টায় শেষ করেছে সে। জায়গাটা তার সুইটেবল
মনে হয়না। তাই প্রতি দিন পাঁচ টাকা বাচিঁয়ে
আকাবাকা গলি মারিয়ে গা থমথম পরিবেশে বাসায় পৌছে। এটা তার নিত্য দিনের রুটিন। বার কয়েক
অনুরোধ করার পরও টিউশন টির টাইম চেইন্স করতে পারেনি সে। আজ শরীরটা কেন জানি ঘামছে।
বার বার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। পা দুটো আরও দ্রুত
চলছে। গলির মোড়ে একটা কালো গাড়ি চোখে পড়ে, ভয়টা আরও বেরে যায়। না দেখার ভান করে গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে সে। হঠাৎ
পেছন দিক থেকে ডাক দেয়। পুলিশের কন্ঠস্বর ,বুজতে দেরী হলোনা।
এত
রাতে কোথায় যাচ্ছিস?
-বাসায়।
বাসা
কোথায়? পুলিশ ধমকের স্বরে জিঙ্গেস করে।
ভয়ে
বুকটা ধরফর করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, তবুও সাহস করে জবাব দেই,
শেউরাপাড়া।
এত রাতে এখানে কি করছিস? পুলিশের পাল্টা প্রশ্ন।
টিউশনিতে
গিয়েছিলাম
এতরাত
হলো কেন? প্রতিদিন তো একই সময় আসা যাওয়া করি । চয়ন জবাব দেয়
তুই
মিথ্যে বলছিস, গাড়িতে উঠ! কথাটি শুনা মাত্র শরীরটা বরফ হয়ে গেল। মাথাটা আরও ঘেমে গেল।
ফোনে একটা টাকাও নাই যে কাউকে জানাবো, আর জানাবই বা কাকে ? আমিতো একায় বাসায় থাকি।
হঠাৎ
গাড়ীর সামনে কালো রঙ্গের গাড়ি এসে থামে। লাল ফ্রেমের চশমা পরা একজন অফিসার নামে গাড়ি
থেকে। আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে।
-অফিসার
, সাবজেক্ট কোথায়?
স্যার,
গাড়ির ভেতরে আছে। অফিসার গাড়ির ভেতর উঁকি দেয়, আরও কাছে আসে। চশমাটা চোখ থেকে খোলে।
আমার চোখে চোখ রাখে। এর পর যা ঘটল , সত্যি বিশ্বাস করার মত না। বন্ধু মন্জু। কোন কথা
না বলে , গাড়ি থেকে নামাল। তুই এই গাড়িতে কেন?
পুলিশ আমাকে গাড়িতে উঠালো, তাই উঠলাম।
চল,
আমার গাড়িতে উঠ, বাসায় যাব। না দোস্ত, আমাকে
বাসায় যেতে হবে।
রাখ
তোর বাসা! অনেক দিন পর তোকে পেয়েছি, বাসায়
না নিয়ে ছাড়ছি না।
গাড়িটি
এসে থামে বনানীর বার নম্বর রোডের ঠিক মাথায়।
কলিং
বেল টিপতেই, ষোল সতের বছরের একটি মেয়ে দরজা খোলে দিল।
-কাকা
তুমি এত দেরী করলে কেন? আর বলিস না মা, পলিশের চাকরি মানুষে করে?
চয়ন,
ওয়াস রুমে গিয়ে, ফ্রেস হয়ে আয়। একসাথে বসে খাবো।
চয়ন,
মোবাইল, ঘড়ি, চশমা ড্রয়িংরুমে রেখে, ওয়াস রুমে থেকে ফ্রেস হয়ে খাওয়ার টেবিলে যায়। দুই বন্ধু মিলে অনেকক্ষন
আলোচনা করে খাওয়া শেষ করে এবং শেওড়া পাড়া চলে আসে।
রাত
বার টা, বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি, কিছুতেই ঘুম আসছেনা। বারবার ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুমাতে
পারছি না। আজকের ঘটনাটা মস্তিস্ক থেকে ঝেরে ফেলতে পারছি না। এরই মধ্যে টেবিলের উপর
রাখা ফোনটা জানান দিচ্ছে কে যেন ডাকছে।
রিং
বাজছে............................. রিং
বাজছে...................
হ্যালো........
। কোন আওয়াজ নেই। ওপাশ থেকে শুধু টেবিল ফ্যানের আওয়াজ ভেসে আসছে। লাইন কেটে দেই। আবার
রিং বাজছে................। হ্যালো ............... । এর পরেও কোন জবাব নেই।
-ভালো
আছেন?
কে
আপনি? আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলেন?
কেন,
আপনিই তো আমাকে ফোন নম্বর দিলেন।
আবারও
চয়ন ঘাবরে গেলেন। এসব কি হচ্ছে আমার সাথেআজ?
সারা শরীর ঘেমে জ্যাবজেবা হয়ে যাচ্ছে।
এখনো
ঘুমোন নি? আবার পাল্টা প্রশ্ন।
কে
,আপনি পরিচয় দিচ্ছেন না কেন?
ভয়
পাচ্ছেন ? আমি ভূত নই , ভয় পাবার কোন কারন নেই।
কে
আপনি? পরিচয় দিচ্ছেন না কেন?
আমি
শুকনো ঘাসফুল। এবার চিনতে পেরেছেন?
সাহিত্য বাদ দেন, আমি সাহিত্য বুঝিনা। দয়া করে পরিচয়
দেন, তা না হলে লাইন টা কেটে দেব।
-দেন,
লাইনটা কেটে দেন। আমি জানি , লাইন কেটে দিলেও আপনি ঘুমাতো পারেবেন না।
বলেই,
লাইন কেটে দিল সে।
এবার চয়নের মগজ টা টনটন করছে। কে ফোন করছে? কে এই মেয়ে....!
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে
ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পরে চয়ন। গন্তব্য চাঙ্খারপূল। একটা চাকরীর ইন্টারভিও আছে। জানিনা
কপালে কি আছে আজ। বিকেলের টিউশনিটার সময় একঘন্টা পিছিয়ে দিয়েছে সে। মাস শেষ , এখন
সময়ের হেরফের হলে সমস্যা। সামনে বার্ষিক পরিক্ষা। পরিক্ষায় ভালো না করতে পারলে,
টিউশনি টা টিকবেনা। আর টিউশনি চলে গেলে দু চোখে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা
যাবেনা।
বাড়ি থেকে মা খঁই আর কলা
পাঠিয়েছে রাতুলের কাছে। রাতুল থাকে ধানমন্ডিতে। আমাদের পাশের গ্রামের সদ্য আকিজ
কোম্পানীতে চাকরী পাওয়া যুবক। প্রথমে তার কাছে যেতে হবে। তার পর অন্য কিছু। লেকের
পাশ দিয়ে হাটঁছি। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। শেষের দুইটি ডিজিট পরিচিত।
-
আপনি আবারও ফোন দিচ্ছেন? কোন জবাব নেই, ফোনটা কেটে যায়। দ্বিধাদন্ধের
মধ্যে পরে যায় সে। না ..কল করা যাবে না। আবারও হাঁটতে থাকে
ফোন
বাজছে........ । বেজেই চলছে। অবশেষে ফোনটা রিসিভ করি।
চয়ন বলছি
আমি
জানি, আপনি চয়ন বলছেন।
-
আল্লাহর দোহায়, আপনি বলেন তো আপনি কে?
আমি
টিউলিপ, টিউলিপ ফুল। পৃথিবীতে সবচেয়ে দুটি মূল্যবান ফুল আছে,
একটি হচ্ছে টিউলিপ, অন্যটি পপি। টিউলিপ দিয়ে উন্নত
দেশগুলোতে বাসর সাজায়, আর পপি ফুল দিয়ে আফিম
সহ না না রকম নেশা জাতীয় দ্রব্য তৈরী হয়।
-
তো আমার কাছে কি চান?
আপনার
বাসর ঘরে আমার পাপঁড়ি গুলো ছড়িয়ে দিতে চাই।
-
কি আজে বাজে কথা বলছেন? ফোন রাখেন, আমি আছি আমার জ্বালায় আর আপনি
আসছেন আমার বাসর সাজাতে। যতস্বব বলে ফোনটা রেখে দেয় চয়ন।
cvU©-2
প্রায়
এক সপ্তাহ হয়ে গেল। সব কিছু আগের মত। কোন ফোন নেই বিরক্তি নেই। দিনগুলি কোনমতে
চলেযাচ্ছে। গতকাল ফোন করেছিল মনজু।
আগামীকাল শুক্রবার সন্ধায় তার বাসায় যেতেহবে। তার বড় ভাইয়ের মেয়ের বার্থ ডে । হাতে মাত্র দুশো টাকা। এই সামান্য টাকা
দিয়ে কি দেওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবছে চয়ন।
পরদিন
শমরেশ মজুমদারের একটা বই কিনে ,ভালোকরে প্যাকেট করে নিয়ে রওনা দেয় সে। দরজায় নক
করতেই , তার ভায়ের মেয়ে দরজা খুলে দেয়ে। খুব সুন্দর করে সেজেছে আজ । মনে হয় তারই জন্ম দিন। কেমন আছেন?
-ভালো,
আস্তে করে জবাব দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যাই। ড্রয়িংরুমে লোকজন ভর্তি। মনজুকেউ দেখলাম
সেখানে বনে আড্ডা দিচ্ছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়।
দোস্ত! এসেছিস? বস , আমার কাছে এসে বস। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল ,যার জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম সে চলে এসেছে। চল সবাইমিলে এখন কেক কাটব।
সবাই টেবিলের সামনে গিয়ে, গোল হয়ে দাড়ালো। কেকের প্যাকেট খোলা হলো। কেকের উপর সুন্দর একটা নাম লিখা। পড়তে অসুবিধা হলোনা। তার সারা শরীর শীতল হয়ে এলো। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে লাগল। এ কি করে সম্ভব। ................ (চলবে)
0 Comments