RONJONA KHAL

 “ পাপড়ির ভেতর ধুলো ”



ce© (1)

স্মৃতির পাতায় ময়লা জমিলেও অক্ষরগুলো একেবারে অপষ্ট হয়ে যায়নি। সব কিছু আবছা আবছা মনে পড়ে। মায়ের পাশে ঘুমানোর স্বভাবটা তখনো শেষ হয়নি। একটু একটু বুঝতে শিখেছি। অভাব শব্দটা দেরী করে এসেছিল পরিবারে। গোয়ালে দুধাল গাই, গোলায় ধান, মালতি, কালোজিরা, তুলসিমালা, পঙ্খিরাজ, বিন্নী নানা রঙ্গের ধানে মাটির ভারায় সাজানো ছিল গোলার চারিধার। প্রায় বাবার মেজাজটা খিটখিটে থাকতো। মনটা নেহাতই কঠিন ছিলনা বাবার।

প্রতিবেশীর বিপদে সবার আগে ঝাপিয়ে পরতেন। নিজে না খেয়ে অনাহারীকে খাইয়ে তৃপ্ত হতেন খুব। মা, বাবার স্বভাবটা আকঁড়ে ধরে ছিলেন অনেক দিন।এখন বাবা নেই।

বাবার পাঞ্জাবীর পকেটের খুচরো পয়সার ঝনঝনানী শব্দ এখন আর কানে আসে না।আইসক্রীমআলা, ছনপাপড়িআলা হাওয়াইমিঠায় আলার পকেটে বাবার খুচরোপয়সাগুলো আর ট্রান্সফার হয়না।

মা সবসময় আমাদের সবার আবদার পূরন করতে চেষ্টা করেতেন।প্রয়োজনের বাইরে বাবার কাছে কিছু বলার সাহস পেত না, কখনো বল্লেও বাবার রক্তিম চাহনিতে মাথা নিচু করে রাখতেন।

আজ আমি,লিখছি,পড়ছি, ডিজিটাল প্লাটফর্মে নিজেকে উজার করে দিচ্ছি সবই হচ্ছে বাবার রক্তচক্ষুর প্রতিফলন।বড় ভাই ছিলেন আলাদা স্বভাবের। বাবাকে ভয় পেতেন ঠিকই কিন্তু শত বাধা সত্তেও তার কোন ইচ্ছে পূরনে কোন বাধা ছিলনা।

একদিন খুব বায়না ধরলাম বাজারে যাব, ভাইয়ের সাথে। মানুষের মুখে মুখে শুনতাম বাজারে নাকি টেলিভিষন দেখা যায়।তাই ভাইও আমকে হাতে ধরে বাজারে নিয়ে গেলেন। জীবনের প্রথম টেলিভিষন দেখা। সাদাকালো টেলিভিষন। বড় স্কুল ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে টেলিভিষন দেখা্চ্ছে।গরমে শরীর ভিজে একাকার। অবশেষে শুরু হলো জিয়াউর রহমানের খালকাটা ভিডিও।টেলিভিষনের দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হচ্ছে সাড়া দুনিয়া আমার চারপাশে ঘুরছে।

এবার এক ঘরুয়া বৈঠকে সিন্ধান্ত নেওয়া হলো আমাকে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতে হবে। দু-একদিন মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, পাঞ্জাবী কিনা জুব্বা পরে ছিলাম, সঠিক মনে নাই।একটু একটু মনে পরে ভবনের মেরামত কাজের জন্য আম গাছের তলায় সবাইকে বৃত্তাকার পথে বসে পড়া শুনা করতে হতো।অব শেষে পাঞ্জাবী আর টুপি আমাকে আকৃষ্ট করতে পারলনা। হুজুরদের করা শাসন আর ছিটকি বেতের বারি আমাকে খুব পীড়া দিত। শেষ অবধি ফিরে এলাম সেখান থেকে।

ce© (2)

এবার ভর্তি হলাম, বাড়ীর পাশেই মিশনারী স্কুলে। এলাকার সব ছোট ছেলেমেয়েরা এখানকার স্টুডেন্ট। পড়াশুনার চাইতে খেলাধুলার আয়োজনই বেশী। ভালই হলো, দিনও বেশ ভালই কাটতে লাগল।বছর শেষে পরিক্ষাও হয়ে গেল। পড়াশুনা আর যাইহোক বয়সের দাপটে দ্বীতিয় স্থান অধিকার করলাম।পুরস্কার হিসেবে পেলাম একটি কাঠপেন্সিল এবং একটি শীতের গেন্জি। কি যে খুশি হলাম, এই সময়ে লেপটপ পেলে যে খুশিটা হতাম, তার চেয়েও বেশী খুশি।

1982 সাল। আমি দ্বিতীয় শ্রেনির ছাত্র।মাথা একেবারে নেহাত মন্দ ছিলনা।কোন কিছু দুই বারের বেশী পড়তে হতো না। বসার বেঞ্চ ছিল ভূমি থেকে তিন কিংবা চার ইঞ্চি উচুঁ। আগের বছর বেঞ্চে বসার যোগ্যতা কিঞ্চিত কম ছিল বিধায়, এবার বাসের তৈরী বেঞ্চে বসতে পেরে একটু ভাব বেড়ে গেলো।

আবার মনটাতে উঁড়ো উড়োঁ  ভাব এসে গেল। বাড়ীর পাশে স্কুল আর ভালো লাগেনা। স্বভাবতই স্কুল থাকবে দূরে। সবাই হৈচৈ করে স্কুলে যাব, বাদরামী করব, বৃষ্টির দিনে বগলে বই নিয়ে ছাতাটাকে তোয়াক্কা না করে কলা পাতা,ফেনপাতা মাথায় দিয়ে, দে...দৌড়..... দে...দৌড়।শীতের দিনে লুঙ্গির ভাজে গরম গরম মুড়ি আর আখের গুড় আরও কত কি! সব মিলিয়ে ভালই হতো।

আবার স্কুল বদল। বাড়ী থেকে প্রায় তিন চার কিলো দূরে।এবার একটু বড় বড় ভাব চলে এল। হাই স্কুলের ছাত্র বলে কথা। ইস্ত্রিকরা জামা কাপড় পরে সাইকেল চালিয়ে গ্রামের মেঠো পথ ধরে যখন স্কুলে যাই, মজাই লাগে, শুধু আমার একার নয়, মনে হয় সবারই।বাম হাতের সাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে হাত মাথায় দিয়ে অনুভব করি স্যাম্পু করা চুল গুলি এখনো উড়ছে কিনা।আশে পাশে একটু তাকাতামও, আর এরফলে কতদিন রাস্তার পাশে ডোবাতে..... আর বল্লাম না। যা হয় আরকি।

যখন ক্লাশ সেভেনে পড়ি, তখন থেকেই সংসারে অভাব বাসা বাধল।নিত্য দিনের অভাব আর ঘুচায়না।সংসারে সদস্য সংখ্যা গেছে বেড়ে।সামান্য জমির ফসলে সাড়া বছর আর কুলিয়ে উঠতে পারেনা।

দু বেলা দুমোঠো খাবার যোগার যেন হয়ে উঠল নাভিশ্বাস।বাবার মেজাজটা দিনে দিনে আরও খিটখিটে হয়ে উঠল।বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো পড়াশুনা।সাহায্যের হাত বাড়ানোর মত আশেপাশে কেউ রইল না একমাত্র আল্লাহ ছাড়া।

অবশেষে আশার প্রদীপ হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো ছোট খালা।ছোট দুটি খালাতো ভাইবোন কে পড়ানোর দায়িত্ব পড়ল আমার উপর।

তাদের সাথে যোগ দিল পাশের বাড়ির আরেকটি ছোট মেয়ে, দুজন থেকে গড়ালো তিন জন।তখনো অভাব পিছু ছাড়লনা।প্রতি মাসে দেরশত টাকা হাতে আসতে লাগল। নেহাত একেবারে খারাপ না।

 মন্দের ভালো এই আরকি।খাতা কলম কিনে মাস শেষে তবু সামান্য বাবার হাতে দিতে পারি।অনেক দিন বাবার হাসিমাখা আর চোখে পড়েনা।অষ্টম শ্রেনিতে পড়ি, অভাব যেন আরও পেয়ে বসল। অভাবে দু চোখে ঝাঁপসা দেখি।

কঠিন অভাবের মধ্যে থাকতে থাকতে সকল আশা স্বপ্ন অনুভূতি গুলি যেন অষ্পষ্ট হয়ে গেলে।সব সময় শুধু একটায় চিন্তা কি খেয়ে বাচঁব।ক্ষুধার জ্বালায় কোন পড়াশুনা মাথায় ঢুকেনা। দিন গুলি যেন আর যেতে চাচ্ছে না।

অবশেষে আমার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে খালা আমাকে তার নিজের বাড়িতে রেখে দিলেন।অন্যের বাড়িতে বেশীদিন ভালো লাগল না।

বর্ষা ঋতু।রাতদিন বৃষ্টি, একটানা দশ দিন ধরে ঝরঝর ঝরছে। ঘরে একমোঠে চাল নাই যে ভাত হবে।বাবা বৃষ্টিতে ভিজেখুব কষ্ট করে কোথ্থেকে যেন এক কেজি চাল যোগার করে আনলেন, আর আমি যে দিনই বুজেছিলাম বাবারা কোন দিনও হারেনা, বাবারা কোন দিনও কাদঁতে শিখেনি। উদাস ভঙ্গিতে দরজার চৌকাঠে বসে ছিলেন মা। বাবার হাতে চাল দেখে মা এক চিলতে হেসেছিল।মা এখন বৃদ্ধ, তার সেই হাসি আজও আমার চোখের কোনে মুক্তদানার মত ঝরে পড়ে।.......... (চলবে)

Post a Comment

0 Comments